হবিগঞ্জের মাধবপুরে ৩ বছর আগের ক্লুলেস হত্যার রহস্যভেদ: সেপটিক ট্যাংক থেকে মিলল দেহাবশেষ, নারীসহ গ্রেপ্তার ৪
স্টাফ রিপোর্টার (শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী):
হবিগঞ্জের মাধবপুরে প্রায় তিন বছর আগে সংঘটিত নিখোঁজ ও চাঞ্চল্যকর ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের জট খুলেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ। প্রযুক্তির নিবিড় ব্যবহার ও একটি অডিও রেকর্ডের সূত্র ধরে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত নারীসহ চার আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাঁদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী একটি বাড়ির সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে নিহত ব্যক্তির মরদেহের অবশিষ্টাংশ (কঙ্কাল ও হাড়গোড়) এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করে পুলিশ।
হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. তারেক মাহমুদ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা:
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—জাহানারা বেগম (৩৪), তাঁর স্বামী মো. শাহ আলম (৪২), শাহ আলমের ছোট ভাই মো. ইয়াছিন মিয়া (২৪) এবং তাঁদের সহযোগী মো. জয়নার মিয়া (২৪)।
দীর্ঘ তদন্ত ও রহস্য উন্মোচনের প্রক্রিয়া:
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৩০ জুলাই মাধবপুর উপজেলায় নিখোঁজ হন স্থানীয় বাসিন্দা মো. মহব্বত আলী। পরবর্তীতে এ ঘটনায় একই বছরের ১৮ আগস্ট মাধবপুর থানায় একটি হত্যা মামলা রুজু হয়। প্রাথমিকভাবে মাধবপুর থানা পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করলেও কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা সূত্র না থাকায় এটি সম্পূর্ণ ‘ক্লুলেস’ অবস্থায় রূপ নেয়। পরবর্তীতে মামলাটির সুষ্ঠু ও দ্রুত তদন্তের স্বার্থে জেলা গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) স্থানান্তর করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই তদন্তে ডিবি পুলিশের চৌকস তদন্তকারী দল তথ্যপ্রযুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণ ও একটি সন্দেহজনক অডিও রেকর্ডের সূত্র ধরে মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় মাধবপুর পৌর এলাকায় গোপন অভিযান চালিয়ে মূল পরিকল্পনাকারী জাহানারা বেগমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জাহানারা হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ দায় স্বীকার করেন এবং রোমহর্ষক তথ্য প্রকাশ করেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাধবপুরের মনতলা এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে তাঁর স্বামী মো. শাহ আলম এবং দুই দেবর ইয়াছিন মিয়া ও জয়নার মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কুপ্রস্তাব ও ব্ল্যাকমেইলের জেরে হত্যাকাণ্ড:
জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, প্রায় তিন বছর আগে নিহত মো. মহব্বত আলী গৃহবধূ জাহানারা বেগমকে অনৈতিক প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে উত্ত্যক্ত করতেন। জাহানারা এতে রাজি না হওয়ায় মহব্বত আলী তাঁর স্বামী ও সন্তানকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেন।
এতে চরম ক্ষুব্ধ ও শঙ্কিত হয়ে জাহানারা বেগম, তাঁর স্বামী শাহ আলম এবং দেবররা মিলে মহব্বত আলীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত নীল নকশা তৈরি করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৩০ জুলাই সুযোগ বুঝে মহব্বত আলীকে হত্যা করা হয় এবং প্রমাণ লোপাট করতে মরদেহটি রাতের আঁধারে গুম করে ফেলা হয়।
সেপটিক ট্যাংক থেকে দেহাবশেষ উদ্ধার ও স্বীকারোক্তি:
গ্রেপ্তারের পর শাহ আলমকে নিয়ে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশের দল। তাঁর সরাসরি দেখানো অনুযায়ী মাধবপুরের রামনগর এলাকায় প্রবাসী রুনা বেগমের বাড়ির সেপটিক ট্যাংকের ঢাকনা খুলে তল্লাশি চালিয়ে দীর্ঘ তিন বছর পর নিহত মহব্বত আলীর মরদেহের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়। একই সাথে হত্যাকাণ্ডের সময় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণও জব্দ করে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত জাহানারা বেগম ও তাঁর স্বামী মো. শাহ আলমকে আদালতে হাজির করা হলে তাঁরা বিজ্ঞ বিচারকের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডে আর কারো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে ডিবি পুলিশের বিস্তারিত তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।