জাপানে ঐতিহাসিক সফর: ৬৩০ কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ ও ২ লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা, টেক পার্ক ও হাইস্পিড রেলের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর
কূটনৈতিক প্রতিবেদক:
জাপান সফরকে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি হিসেবে অভিহিত করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির (Sanae Takaichi) সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ শীর্ষ বৈঠক শেষে এই সফরের সার্বিক অর্জন, দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করেছেন তিনি।
আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর ২০২৬) টোকিওতে দুই সরকারপ্রধানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক এই শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তোলার লক্ষ্যে ঢাকা ও টোকিওর অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে জরুরি সহায়তা ও ৬৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনা:
প্রধানমন্ত্রী জানান, আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল দ্বিপাক্ষিক এই অংশীদারত্বকে বাংলাদেশের জনগণের জন্য বাস্তব ও দৃশ্যমান অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করা।
জরুরি জ্বালানি সহায়তা: বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুসংহত করতে জাপানের ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় ৫০ বিলিয়ন (৫ হাজার কোটি) জাপানি ইয়েন—যা প্রায় ৩২ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের জরুরি আর্থিক সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
২ লাখ কর্মসংস্থান ও বিশাল বিনিয়োগ: আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে সর্বোচ্চ ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) জাপানি ইয়েন—যা প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের জোরালো সম্ভাবনার বিষয়ে উভয় পক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রায় ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তরুণ কর্মশক্তির জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচন করবে।
টেক পার্ক, মহাকাশবিজ্ঞান ও ৬ বিভাগে হাইস্পিড রেলের প্রস্তাব:
বৈঠকে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যৌথ অগ্রযাত্রার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন এবং উন্নত প্রযুক্তির গবেষণায় গতি আনতে তিনি একটি ‘বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক’ প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তুলে ধরেন।
পাশাপাশি মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চতর সহযোগিতার বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়। এছাড়া বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে দেশের প্রধান ছয়টি বিভাগীয় শহরের মধ্যে আধুনিক ও দ্রুতগতির ‘উচ্চগতির রেল যোগাযোগ’ (High-Speed Rail) স্থাপন এবং উন্নত পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণে জাপানের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা কামনা করা হয়।
বিগ-বি (BIG-B) উদ্যোগের নবায়ন ও অর্থনৈতিক চুক্তি:
শীর্ষ বৈঠকের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বিগ-বি’ (Bay of Bengal Industrial Growth Belt - BIG-B) উদ্যোগকে যৌথ সমৃদ্ধির এক নতুন রূপরেখায় এগিয়ে নেওয়ার অভিন্ন প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। এই সমন্বিত কাঠামোর আওতায় গভীর সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি করিডোর, ভারী শিল্প অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি অগ্রাধিকার পাবে—যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে মূল সংযোগসেতু হিসেবে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে বহুগুণ শক্তিশালী করবে।
এ ছাড়া ‘বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ (EPA) দ্রুত বাস্তবায়ন এবং অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলো দ্রুত সম্পাদনের জন্য মন্ত্রী পর্যায়ের একটি ‘যৌথ কমিশন’ গঠনের বিষয়েও একমত হয়েছেন দুই নেতা।
ঐতিহাসিক সম্পর্কের স্মৃতিচারণ ও রোহিঙ্গা সংকট:
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্মরণ করেন যে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে তাঁর মরহুমা মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া একাধিক সরকারি সফর ও গভীর দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে সেই সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
রোহিঙ্গা সংকটে জাপানের অব্যাহত মানবিক সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে টোকিওকে আরও জোরালো ও সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম সারির দেশ হিসেবে জাপানের বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদারিত্বের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর বাংলাদেশ যখন একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের সরকার বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, আধুনিক অবকাঠামো এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি বিনির্মাণে সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
জাপান সরকার ও জনগণের আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ককে আরও সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এস এম সোহাগ ফরাজী