বাংলাদেশ-জার্মানি সম্পর্ক ও শ্রম খাতের উন্নয়ন নিয়ে শ্রমমন্ত্রীর সাথে জার্মান ভাইস মিনিস্টারের বৈঠক: সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস বার্লিনের
বিশেষ প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যকার দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদারত্ব জোরদার এবং দেশের শ্রম খাতের টেকসই রূপান্তরের লক্ষ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে শ্রমিকের শোভন কাজ, ন্যায্য অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও আইনি সুরক্ষায় অন্তর্বর্তী ও বর্তমান সরকারের ইতিবাচক সংস্কারের প্রশংসা করেছে জার্মান প্রতিনিধিদল।
আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর ২০২৬) শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও আনুষ্ঠানিক বৈঠকে অংশ নেন জার্মান ফেডারেল ইকোনমিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট মিনিস্ট্রির ভাইস মিনিস্টার ড. বার্বেল কফলার (Dr. Bärbel Kofler)।
সাক্ষাতকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লটজসহ (Dr. Rüdiger Lotz) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার।
শ্রমিক অধিকার ও শোভন কর্মসংস্থানে সরকারের অগ্রাধিকার:
সৌজন্য সাক্ষাৎকালে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের অন্যান্য মন্ত্রীদের সঙ্গে আপনাদের ধারাবাহিক যোগাযোগ ও বৈঠক দুই দেশের ঐতিহাসিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে। স্বাধীনতার পর থেকেই জার্মানির সঙ্গে বাংলাদেশের চমৎকার সহযোগিতামূলক সম্পর্কের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।”
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দেশের শ্রমশক্তির সার্বিক কল্যাণ, শোভন কাজের পরিবেশ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে শতভাগ প্রতিশ্রুতবদ্ধ। শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, শক্তিশালী ত্রিপক্ষীয় সামাজিক সংলাপ এবং পেশাগত দক্ষতা অর্জনের পরিবেশ নিশ্চিত করাই সরকারের মূল অগ্রাধিকার, যা নির্বাচনী রূপরেখায় সুস্পষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে।
শ্রম আইন সংশোধনী ও আইএলও কনভেনশন অনুস্বাক্ষর:
সরকারের সাম্প্রতিক অর্জন তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই যুগোপযোগী ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধনী’ সফলভাবে পাস করা হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন ১৫৫, ১৮৭ এবং ১৯০ অনুস্বাক্ষর ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ গড়ায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে সংশোধিত আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা সংশোধনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে—যা একদিকে শ্রমিকদের জীবনমানের সুরক্ষা দেবে, অন্যদিকে দায়িত্বশীল উদ্যোক্তা তৈরি ও টেকসই বিদেশি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে।
এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম (EIS) সম্প্রসারণ:
কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, ২০২২ সালের জুন থেকে দেশের তৈরি পোশাক খাতে আইএলও কনভেনশন ১২১-এর আলোকে ‘এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম’ (EIS) পাইলট ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর আওতায় দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ববরণ বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারকে নিয়মিত মাসিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।
ইতোমধ্যে এই স্কিমটি ইপিজেড এবং চামড়া ও পাদুকা শিল্পেও সফলভাবে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। প্রকল্পটিকে স্থায়ী জাতীয় রূপরেখা দিতে একটি উপযুক্ত অর্থ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নির্ধারণের কাজ চলছে, যেখানে জার্মান সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতার জন্য মন্ত্রী আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
জার্মানির প্রশংসা ও টেকসই বাণিজ্যের গুরুত্ব:
বাংলাদেশ শ্রম আইনের প্রয়োগ ও শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন জার্মান ভাইস মিনিস্টার ড. বার্বেল কফলার। তিনি বলেন, “শ্রম আইন সংশোধন ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা বাংলাদেশের শ্রম খাতের জন্য এক বিরাট অগ্রগতি। শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় এসব আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে জার্মানি বাংলাদেশকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।”
ড. কফলার আরও গুরুত্বারোপ করে বলেন, “মর্যাদাপূর্ণ ও শোভন কর্মপরিবেশ ছাড়া কোনো আধুনিক ব্যবসায় মডেল টেকসই হতে পারে না। জার্মানিতে অতীতে হয়তো কেবল সাশ্রয়ী মূল্যে পোশাক কেনার প্রবণতা ছিল, কিন্তু বর্তমান জার্মান ভোক্তারা পোশাক তৈরি করা মেহনতি শ্রমিকদের সুস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অত্যন্ত সচেতন ও সংবেদনশীল।”
উক্ত সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান, অতিরিক্ত সচিব আ স ম আশরাফুল ইসলাম, অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবীর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক মো. ফরহাদ সিদ্দিক এবং শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুছ সামাদ আল আজাদসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এস এম সোহাগ ফরাজী