‘দেশ আবারও মাফিয়া স্টেটে পরিণত হচ্ছে, আরেকটা ফ্যাসিবাদের জন্ম হতে দেওয়া যাবে না’: রাজবাড়ীতে নাহিদ ইসলাম
স্টাফ রিপোর্টার:
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতা মো. নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশ আবারও একটি মাফিয়া স্টেটে পরিণত হচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে জবাবদিহিহীনভাবে ছাড় দিলে দেশকে ভবিষ্যতে আবারও নতুন কোনো ফ্যাসিবাদের মুখোমুখি হতে হতে পারে।
আজ বুধবার (২৮ অক্টোবর ২০২৬) রাজবাড়ীতে আয়োজিত এনসিপির সাংগঠনিক অগ্রগতি ও আগামী নির্বাচনী পরিকল্পনা সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায় গণমাধ্যমকর্মীদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা বিভাগ দক্ষিণ অঞ্চলের জেলাগুলোর শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এই সভার আয়োজন করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচার ব্যবস্থার সংকট:
ব্রিফিংয়ের শুরুতে দেশের চলমান পরিস্থিতি তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নাজুক ও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছালে নিজেদের দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিজেরাই নিজেদের লোক হত্যা করে! এর প্রকৃত বিচার হবে কি না, তা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিচার ব্যবস্থার মৌলিক ও টেকসই সংস্কার যেহেতু হয়নি, ফলে এটি এখনও ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণেই কুক্ষিগত থেকে গেছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “সারাদেশে প্রভাব খাটিয়ে দলীয় ক্যাডার বাহিনী একদিকে নিজেদের লোকজনকে খুন করছে, অন্যদিকে নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর অন্যায় জুলুম-নিপীড়ন ও নির্যাতন চালাচ্ছে।”
নতুন ফ্যাসিবাদের ঝুঁকি ও মাফিয়া স্টেটের রূপরেখা:
জনগণের রক্তে অর্জিত পরিবর্তনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা যদি এই প্রশাসন ও সরকারকে অন্ধভাবে ছাড় দিতে থাকি, তবে কে জানে—হয়তো আমাদের আবারও আরেকটি ফ্যাসিবাদের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা কোনোভাবেই চাই না আবার ১৪০০ মানুষের তাজা রক্ত আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে নতুন কোনো ফ্যাসিবাদকে উৎখাত করতে রাজপথে নামতে হোক।”
দেশকে মাফিয়া স্টেটের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম একটি নিরপেক্ষ, পেশাদার ও শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু তার বিপরীতে দেখতে পাচ্ছি আইজিপি ক্রসফায়ারের কথা বলছেন, আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কার্যকর নেতৃত্ব প্রদানে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। দেশে চিহ্নিত মাদকের স্পটগুলো সম্পর্কে তথ্য থাকলেও সেগুলোর বিরুদ্ধে কোনো টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।”
তিনি যোগ করেন, “বাংলাদেশ মূলত আগের সেই মাফিয়া স্টাইলেই রয়ে গেছে, মৌলিক কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন হয়নি। একদিকে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হাতে ভারী অস্ত্র, অন্যদিকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। নিজের নিরাপত্তার জন্য নাগরিকদের যখন নিজেই অস্ত্র তুলে নিতে হয়, সেই রাষ্ট্রকেই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় মাফিয়া স্টেট বলে।”
মাদক সিন্ডিকেট ও কক্সবাজার ইস্যু:
মাদক বাণিজ্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “প্রশাসন মাদকের মূল গডফাদার ও রাঘববোয়ালদের স্পর্শ করছে না। যারা বড় বড় সিন্ডিকেটের পেছনে রয়েছে কিংবা যেসব প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা এসব কারবারে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। তাঁদের না ধরলে মাদক নির্মূল কখনোই সম্ভব নয়। জাতীয় সংসদেও অভিযোগ উঠেছে যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিজস্ব এলাকা কক্সবাজার দিয়েই দেশের প্রধান মাদক চালানগুলো প্রবেশ করে। তিনি যদি নিজের এলাকাতেই মাদক চোরাচালান বন্ধ করতে না পারেন, তবে জাতীয়ভাবে মাদক নির্মূল কীভাবে সম্ভব?”
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরিবেশ:
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ দেখে কোনোভাবেই মনে হচ্ছে না যে ভোট শান্তিপূর্ণ হবে। সরকারদলীয় অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হানাহানিতে ইতোমধ্যে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। নির্বাচন কমিশন ও মাঠ পর্যায়ের পুলিশ প্রশাসন ক্রমাগত দলীয়করণের শিকার হচ্ছে। এমন ভঙ্গুর ও পক্ষপাতদুষ্ট বাস্তবতায় কোনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়।”
সাংগঠনিক এই মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ও রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সারজিস আলম, রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য আরিফুল ইসলাম আদীবসহ ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও রাজবাড়ী জেলার শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
এস এম সোহাগ ফরাজী