‘খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই কঠিন’: রাজধানীতে আলু-পেঁয়াজে সামান্য স্বস্তি মিললেও সবজি ও মাছ-মাংসের চড়া দামে দিশেহারা সাধারণ মানুষ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর কাঁচাবাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অব্যাহত চড়া দামে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ও নিম্ন আয়ের ক্রেতারা। আলু, পেঁয়াজ, রসুন ও আদার দামে কিছুটা স্বস্তি মিললেও অধিকাংশ সবজির দাম কেজিপ্রতি ৮০ টাকার ওপরে অবস্থান করছে। মাছ, মাংস, ডিম ও মুদি পণ্যের বাজার চড়া থাকায় আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বল্প আয়ের মানুষ।
বাজার করতে আসা সাধারণ ক্রেতাদের সাফ কথা—বর্তমান বাজারে চাল-ডাল ও তরিতরকারি কিনে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অধিকাংশ সবজিই ৮০ টাকার ওপরে:
আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর ২০২৬) রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দু-একটি পণ্য ছাড়া প্রায় সব ধরনের সবজিই উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে।
মানভেদে প্রতি কেজি দেশি টমেটো ১৬০ টাকা, ভারতীয় টমেটো ১২০ টাকা এবং কাঁচা টমেটো ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
দেশি গাজর ১০০ টাকা, চীনা গাজর ১৪০ টাকা এবং ভারতীয় নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা কেজিতে।
প্রতি কেজি লম্বা বেগুন ৮০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ১০০ টাকা, কালো গোল বেগুন ১২০ টাকা, শিম ১২০ টাকা, দেশি শসা ১২০ টাকা এবং কাঁকরোল ও ঢ্যাঁড়শ ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
হাইব্রিড পটল, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, ঝিঙা ও বরবটি বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। দেশি পটল ১২০ টাকা, কচুর লতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কচুরমুখী ১০০ টাকা এবং মূলা বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়।
মসলাজাতীয় পণ্যের মধ্যে কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ১৬০ টাকা এবং ধনেপাতা বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।
কিছুটা কম দামের মধ্যে পেঁপে ৪০ টাকা ও মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা কেজিতে পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিটি লাউ ৮০ থেকে ১০০ টাকা, চালকুমড়া ৬০ টাকা এবং ফুলকপি ও বাঁধাকপি বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা পিস হিসেবে। কাঁচা কলা ও লেবুর হালি বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়।
বিক্রেতারা জানান, সবজির দাম মূলত সরবরাহ, পরিবহন ব্যবস্থা ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে। বৃষ্টি বা সরবরাহ সংকট দেখা দিলে পাইকারি বাজারে দাম দ্রুত বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে খুচরা বাজারে।
আলু, পেঁয়াজ, রসুন ও আদায় সামান্য ছাড়:
সবজির বাজারে আগুন থাকলেও গত সপ্তাহের তুলনায় কয়েকটি মশলা ও কন্দজাতীয় পণ্যের দাম কিছুটা কমেছে। বাজারে লাল ও সাদা আলু এবং ক্রস জাতের পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৫ টাকা করে কমেছে। বর্তমানে ক্রস জাতের পেঁয়াজ ৫০ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ আলু ২৫ টাকা হলেও বগুড়ার লাল আলু বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকায়।
এ ছাড়া দেশি রসুনের দাম কেজিতে ২০ টাকা কমে ১০০ টাকা এবং চীনা আদার দাম ৪০ টাকা কমে ১৬০ টাকায় নেমেছে। তবে চীনা রসুন বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে।
ডিম, মুরগি ও মাংসের বাজার অপরিবর্তিত:
প্রোটিনের বাজারে নতুন করে স্বস্তির কোনো খবর নেই। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৬৮ থেকে ১৮৮ টাকা, কক মুরগি ৩০০ থেকে ৩১০ টাকা, লেয়ার ৩২০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬২০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস কেজিপ্রতি ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২৫০ টাকায় স্থির রয়েছে। লাল ডিম ডজনপ্রতি ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা, সাদা ডিম ১২০ টাকা এবং হাঁসের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়।
মাছ ও মুদি পণ্যেও চড়া সুর:
মাছের বাজারে আকারভেদে রুই ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা, কাতল ৩০০ থেকে ৫৫০ টাকা, চিংড়ি ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং কাঁচকি ও পাবদা বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজিতে। নদী ও বিলের কাজলি মাছ কেজিপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং বাতাসি মাছ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মুদি দোকানে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ২০৪ টাকা, খোলা সয়াবিন ২০৫ টাকা এবং সরিষার তেল ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোট দানার মসুর ডাল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, মোটা মসুর ডাল ৯০ টাকা, চিনি ১১০ টাকা এবং দুই কেজির প্যাকেট আটা ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মসলার বাজারে এলাচ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি রেকর্ড ৫ হাজার ৪০০ টাকায়।
ক্রেতাদের ক্ষোভ ও সংকট:
বাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী শেখ আল-আমিন বলেন, “বাজারে এসে প্রয়োজনীয় পরিমাণের চেয়ে অনেক কম কিনতে হচ্ছে। ছোট পরিবার হয়েও খরচ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। যাদের পরিবার বড় এবং নির্দিষ্ট সামান্য আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের পক্ষে এই বাজারে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
কয়েকটি পণ্যের দাম সামান্য কমলেও সামগ্রিক নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি না ফেরায় বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারি দাবি করেছেন সাধারণ ভোক্তারা।
এস এম সোহাগ ফরাজী