সিলেটে রেস্টুরেন্টে তরুণ-তরুণীর গোপনে ছবি তুলে অনলাইনে সাম্প্রদায়িক অপপ্রচার: মেহমানের দুই কর্মচারী গ্রেপ্তার
সিলেট ব্যুরো:
সিলেট মহানগরীর জিন্দাবাজার এলাকায় একটি রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে যাওয়া দুই তরুণ-তরুণীর গোপনে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে ধর্মীয় উসকানি ও অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তার দুজনই নগরের জিন্দাবাজারের সুপরিচিত ‘মেহমান রেস্টুরেন্ট’-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—গোয়াইনঘাট উপজেলার বাসিন্দা (বর্তমানে নগরের কাজিটুলা এলাকায় বসবাসরত) আহবাবুজ্জামান আনোয়ার (২৪) এবং হবিগঞ্জ জেলার বাসিন্দা (বর্তমানে জিন্দাবাজার সিতারা ম্যানশনের বাসিন্দা) মো. সামছুল আমীন (২৭)।
এ ঘটনায় আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর ২০২৬) সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী যুবক, নগরের কাষ্টঘর এলাকার বাসিন্দা উমাশঙ্কর গুপ্ত চৌধুরী। এর আগে রোববার দিবাগত মধ্যরাতে মেহমান রেস্টুরেন্টে অভিযান চালিয়ে ওই দুই কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
ঘটনার বিবরণ ও ভুক্তভোগীর অভিযোগ:
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার বিকেলে উমাশঙ্কর গুপ্ত চৌধুরী তাঁর বান্ধবী ফারিয়া সুলতানা আনিসাকে সঙ্গে নিয়ে জিন্দাবাজারের মেহমান রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে যান। সেখানে অবস্থানকালে রেস্টুরেন্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা গোপনে তাঁদের ছবি তোলেন। পরবর্তীতে সেই ছবিগুলো ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাঁদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, উসকানি ও সাইবার হেনস্তা শুরু হয়।
মামলার বাদী উমাশঙ্কর গুপ্ত চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, “ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও আইডি থেকে পরিকল্পিতভাবে আমার ও আমার বান্ধবীর ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে অব্যাহতভাবে অপপ্রচার, সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন এবং উসকানিমূলক নানা ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। এর ফলে আমি ও আমার বান্ধবীর পরিবারের দীর্ঘদিনের সামাজিক মর্যাদা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। আমরা সামাজিক ও মানসিকভাবে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি।”
সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত ও পুলিশের অভিযান:
ঘটনার পর বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনের নজরে এলে সিলেট মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি চৌকস দল তদন্তে নামে। পুলিশ মেহমান রেস্টুরেন্টের অভ্যন্তরীণ সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে। ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, রেস্টুরেন্টের কর্মী আহবাবুজ্জামান আনোয়ার এবং মো. সামছুল আমীন কৌশলে দায়িত্ব পালনের আড়ালে ওই তরুণ-তরুণীর ছবি মুঠোফোনে ধারণ করছেন।
ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতে রোববার গভীর রাতে রেস্টুরেন্টটিতে তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে হাতেনাতে ওই দুজনকে আটক করা হয়। তাঁদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও জব্দ করেছে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, গোপনে তোলা এই ছবিগুলো কোন কোন ফেসবুক পেজ, আইডি বা গ্রুপের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কারা নেপথ্যে থেকে সাম্প্রদায়িক উসকানি সৃষ্টি করেছে, তাদের শনাক্ত করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিট কাজ করছে।
সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মো. মঈনুল জাকির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে আসা নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে গোপনে ছবি তোলা এবং তা সাইবার জগতে ছড়িয়ে হেনস্তা করার অভিযোগে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ভুক্তভোগীর এজাহারের প্রেক্ষিতে তাঁদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা রুজু হয়েছে। এ ধরনের সাইবার বুলিং ও হয়রানির সঙ্গে যুক্ত বাকিদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”
এস এম সোহাগ ফরাজী