ফ্যাসিবাদ আমল থেকে ইউনূস ও তারেক রহমানের প্রেস উইং: আশরোফা ইমদাদকে নিয়ে সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ
অনুসন্ধানী ডেস্ক:
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুযোগ-সুবিধাভোগী ও প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত ৩৫তম বিসিএস তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা আশরোফা ইমদাদ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কীভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং পরবর্তী সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থাকলেন, তা নিয়ে সাংবাদিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
বিতর্কের মুখে সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব পদ থেকে প্রত্যাহার করে মূল মন্ত্রণালয় তথ্য ও সম্প্রচারে ফেরত পাঠানো হয়েছে। গত ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপন (স্মারক নং ০৫.০০.০০০০.১০২.১৯.০৫২.২০-১২৪৬) অনুযায়ী তাঁকে তথ্য অধিদপ্তরে ন্যস্ত করা হয় এবং ১৫ অক্টোবর থেকে তিনি সেখানে যোগদান করেছেন। তবে পদ থেকে প্রত্যাহার হলেও তাঁর মতো বিতর্কিত কর্মকর্তার এমন নির্বিঘ্ন পদচারণা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
ফ্যাসিবাদী আমলে অ্যাক্রিডিটেশন ও প্রটোকল নিয়ন্ত্রণ:
সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, আশরোফা ইমদাদ ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে তথ্য ক্যাডারে নিয়োগ পেয়ে ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে চাকরিতে যোগদান করেন। যোগদানের পরপরই প্রভাব খাটিয়ে তিনি তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ দুটি ডেস্ক—প্রটোকল শাখা এবং সাংবাদিকদের প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বাগিয়ে নেন। সচিবালয়ে প্রবেশ ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই শাখাটি মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, ওই সময় অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড ইস্যু ও নবায়নের ক্ষেত্রে তিনি চরম বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করেন। রাজনৈতিক আনুগত্য যাচাইয়ের নামে ভিন্নমতাবলম্বী ও বিএনপি ঘরানার সাংবাদিকদের আবেদন ঢালাওভাবে বাতিল ও হয়রানি করার পেছনে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল।
৫ আগস্টের পর রহস্যজনক উত্থান ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন:
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পতনের পর বিগত আমলের সুবিধাভোগী দোসরদের চিহ্নিত করে অপসারণের প্রত্যাশা ছিল সর্বমহলে। কিন্তু প্রশাসনিক বাস্তবতায় দেখা যায় সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, পটপরিবর্তনের পরপরই ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে তিনি তৎকালীন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন লাভ করেন। এর মাত্র এক মাসের ব্যবধানে, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে তাঁকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সহকারী প্রেস সচিব হিসেবে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রহস্যজনক পদোন্নতি ও প্রভাবের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ৩ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অপর এক আদেশে তাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহকারী প্রেস সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সাংবাদিক সমাজের ক্ষোভ ও প্রশ্ন:
বিগত সরকারের আমলে বিরোধীমতের সংবাদকর্মীদের ওপর খড়্গহস্ত হওয়া একজন কর্মকর্তা কীভাবে পর পর দুটি ভিন্ন সরকারের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধানদের প্রেস উইংয়ে নিজের জায়গা করে নিলেন—তা নিয়ে সাংবাদিক সমাজ এখন ক্ষোভে ফুঁসছে।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও পেশাজীবী সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা বলছেন, সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের চারপাশে ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগী চক্র কীভাবে ছদ্মবেশে অবস্থান নিচ্ছে, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে নীতিনির্ধারকদের অজ্ঞাতসারে কারা এই ধরনের বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর সুপারিশ করছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা প্রয়োজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র সাংবাদিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা ভোল পাল্টে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চেপে বসেছে। আশরোফা ইমদাদের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং প্রশাসনের গভীরে থাকা সুবিধাভোগী চক্রের দৌরাত্ম্যের স্পষ্ট উদাহরণ।”
সাংবাদিক নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছেন, কেবল মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরে ফেরত পাঠানোই যথেষ্ট নয়; বিগত দিনে পেশাগত অসদাচরণ ও ভিন্নমতের সাংবাদিকদের নিপীড়নে জড়িত থাকার অভিযোগে এই কর্মকর্তাকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, অন্যথায় সাংবাদিক সমাজ বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে।
এস এম সোহাগ ফরাজী