টিকটকে পরিচয় ও স্বাধীন জীবনের মোহে ঘর ছাড়ে কুমিল্লার ৪ শিশু শিক্ষার্থী: ঢাকা ঘুরে হবিগঞ্জ থেকে উদ্ধার
স্টাফ রিপোর্টার:
জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে অপরিণামদর্শী পরিচয় এবং তথাকথিত ‘স্বাধীনভাবে উপার্জনের’ অবাস্তব স্বপ্নে ঘর ছেড়েছিল কুমিল্লার চার শিশু শিক্ষার্থী। পরিবারের স্বর্ণালংকার ও মুঠোফোন বিক্রি করে ঢাকা ঘুরে শেষ পর্যন্ত হবিগঞ্জের চুনারুঘাট পৌঁছালে স্থানীয় সিএনজিচালকের সহায়তায় রাতেই তাদের উদ্ধার করে পুলিশ।
উদ্ধার হওয়া চার শিশুর মধ্যে তিনজন পঞ্চম শ্রেণির এবং একজন তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। তারা সবাই কুমিল্লা মহানগরীর একটি স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর ২০২৬) দুপুরে নিজ সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।
স্কুলে যাওয়ার কথা বলে নিখোঁজ:
পুলিশ ও পরিবারের সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে প্রতিদিনের মতো স্কুলের পোশাক পরে ক্লাসে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় ওই চার ছাত্রী। তবে দুপুরের পর স্কুল ছুটির সময় পেরিয়ে গেলেও তারা বাড়ি ফিরে না আসায় পরিবার খোঁজ নিতে শুরু করে। একপর্যায়ে জানা যায়, সেদিন তারা স্কুলেই উপস্থিত হয়নি। আশপাশের সম্ভাব্য সকল স্থানে খোঁজাখুঁজি করে ব্যর্থ হয়ে স্বজনরা দ্রুত কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে তাৎক্ষণিক ছায়াতদন্তে নামে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও থানা পুলিশ।
স্বর্ণালংকার ও ফোন বিক্রি করে ঢাকা পাড়ি:
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘর ছাড়ার সময় এক শিশুর বাড়ি থেকে পারিবারিক স্বর্ণালংকার এবং একটি ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন সঙ্গে নেয় তারা। এরপর কুমিল্লা টাউন হল মার্কেটের একটি দোকানে গিয়ে মাত্র ৪ হাজার টাকায় ফোনটি বিক্রি করে। সেই টাকায় টিকিট কেটে সকাল ১১টার মধ্যে তারা রাজধানী ঢাকায় পৌঁছে যায়।
ঢাকায় পৌঁছে বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা চালালে তাদের বয়স একেবারে কম হওয়ায় কোনো বাড়ির মালিক তাদের কাছে বাসা ভাড়া দিতে রাজি হননি। রাজধানীতে থাকার কোনো উপায় না দেখে তাদেরই একজনের দাদাবাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় হওয়ায় তারা আবার বাসে চড়ে হবিগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
সিএনজিচালকের সচেতনতায় উদ্ধার:
সোমবার দিবাগত রাতে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট বাজারে পৌঁছে উদ্দেশ্যহীনভাবে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে ঘোরাঘুরি করছিল তারা। গভীর রাতে এত কম বয়সী চার মেয়েকে অভিভাবক ছাড়া সন্দেহজনকভাবে ঘুরতে দেখে সিএনজিচালকের মনে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়। কালবিলম্ব না করে ওই সচেতন চালক স্থানীয় চুনারুঘাট থানায় খবর দেন।
খবর পেয়ে চুনারুঘাট থানা পুলিশ দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে চার শিশুকে নিরাপদ হেফাজতে নেয়। পরবর্তীতে কুমিল্লা জেলা পুলিশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয় এবং কুমিল্লা থেকে পুলিশের একটি টিম গিয়ে তাদের উদ্ধার করে জেলায় ফিরিয়ে আনে। পরে কুমিল্লা গোয়েন্দা পুলিশ অভিযান চালিয়ে টাউন হল মার্কেট থেকে বিক্রি হওয়া মোবাইল ফোন ও সঙ্গে নেওয়া স্বর্ণালংকার অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে।
স্বপ্নের আড়ালে টিকটকের ফাঁদ:
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, উদ্ধার হওয়া শিশুদের মধ্যে পঞ্চম শ্রেণির তিন ছাত্রীর দুজনের বয়স ১২ বছর ও একজনের বয়স ১৩ বছর। আর তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া শিশুটির বয়স মাত্র ৮ বছর।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ওই ছাত্রীরা নিয়মিত টিকটকে ভিডিও তৈরি ও আপলোড করত। ভার্চুয়াল এই প্ল্যাটফর্মেই বিভিন্ন অচেনা তরুণ ও যুবকের সঙ্গে তাদের পরিচয় এবং যোগাযোগ গড়ে ওঠে। পরিবারের জ্যেষ্ঠ মেয়েটি যখন ঘর ছাড়ার পরিকল্পনা করে, তখন তার ছোট বোন (তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী) বিষয়টি টের পেয়ে যায়। ছোট বোন ঘটনাটি মা-বাবাকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বললে ধরা পড়ার ভয়ে তাকেও দলে নিয়ে বাড়ি ছাড়ে তারা। তাদের পরিকল্পনা ছিল ঢাকা গিয়ে যেকোনো কাজ বা উপার্জন করে নিজেরা স্বাধীন জীবন কাটাবে।
পুলিশ সুপার অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “সন্তানরা কখন কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মেলামেশা করছে এবং বিশেষ করে তারা স্মার্টফোনে কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে—সে বিষয়ে প্রতিটি অভিভাবককে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত অপব্যবহার শিশুদের ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে। পারিবারিকভাবে খোলামেলা আলোচনা ও গভীর বন্ধন বজায় রাখলেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব।”
এ ঘটনায় কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় দায়েরকৃত সাধারণ ডায়েরির (জিডি) ভিত্তিতে পরিবারের কাছে শিশুদের আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে।
এস এম সোহাগ ফরাজী