গোয়াইনঘাটে পূর্ববিরোধের জেরে কৃষককে কুপিয়ে হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন: হাসপাতালে মৃত্যুযন্ত্রণা
সিলেট প্রতিনিধি:
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় পূর্বশত্রুতার জেরে পথরোধ করে হারিছ আলী (৫৫) নামের এক প্রান্তিক কৃষকের ডান হাতের কবজি দা দিয়ে কুপিয়ে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় বর্তমানে তিনি সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রবিবার (১১ অক্টোবর ২০২৬) রাত সাড়ে আটটার দিকে গোয়াইনঘাট উপজেলার তোয়াকুল বাজার থেকে নিজ বাড়ি ফেরার পথে কামারগ্রাম এলাকার একটি নির্জন বাঁশঝাড়ের পাশে এ নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে।
আহত কৃষক হারিছ আলী উপজেলার ফুলতৈছ গ্রামের বাসিন্দা। কৃষিকাজই তাঁর পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস।
হাসপাতালের বিছানায় ভুক্তভোগীর লোমহর্ষক বর্ণনা:
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে হারিছ আলী জানান, রবিবার রাতে তোয়াকুল বাজারে একটি স্থানীয় সালিস বৈঠক শেষে তিনি হেঁটে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় তাঁর পেছনে আরও একজন পথচারী ছিলেন। কামারগ্রাম এলাকায় পৌঁছামাত্র বিপরীত দিক থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসে হঠাৎ তাঁর সামনে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, “অটোরিকশা থেকে দা ও লাঠিসোঁটাসহ পাঁচজন ব্যক্তি নেমে এসে চিৎকার করে বলে—‘গুন্ডারে বহুত দিনে পাইছি।’ মুহূর্তের মধ্যেই একজন ধারালো দা উঁচিয়ে মাথায় কোপ দেওয়ার চেষ্টা করে। জীবন বাঁচাতে আমি ডান হাত তুলে কোপ ঠেকাতে গেলে দা’র আঘাতে কবজির ওপরের অংশ সম্পূর্ণ কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে যায়। এরপর তারা আমাকে মাটিতে ফেলে লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। পেছনের পথচারী ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান।”
তিনি আরও জানান, তাঁর আর্তচিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে হামলাকারীরা অটোরিকশা নিয়ে দ্রুত চম্পট দেয়। স্থানীয়রা রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে সড়কের পাশের খাদ থেকে উদ্ধার করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ঠেকাতে এক পথচারী নিজের পরনের পাঞ্জাবি দিয়ে কাটা হাতটি শক্ত করে বেঁধে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। বিচ্ছিন্ন হওয়া কবজিটি এখনও ঘটনাস্থল থেকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীর দাবি, হামলাকারী পাঁচজনকে তিনি স্পষ্টভাবে চিনতে পেরেছেন। তারা হলেন একই গ্রামের এমরান, মোহাম্মদ, বুরহান, নজরুল ও অটোরিকশাচালক ইমাম। এর মধ্যে এমরান, মোহাম্মদ ও বুরহান সহোদর তিন ভাই এবং এমরানই সরাসরি দা দিয়ে কুপিয়ে তাঁর হাত বিচ্ছিন্ন করেছে।
হামলার নেপথ্যে গরু চুরির পুরোনো বিরোধ:
হারিছ আলী জানান, হামলাকারীদের অন্যতম নজরুলের সঙ্গে তাঁর পূর্ববিরোধ ছিল। গত চৈত্র মাসে (মার্চের দিকে) তাঁর একটি মূল্যবান গরু চুরি হয়ে যায়। পরবর্তীতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে গরুটি উদ্ধার করতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, নজরুলই গরুটি চুরি করে অন্য স্থানে লুকিয়ে রেখেছিল। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে সালিসে ঘটনার নিষ্পত্তি হলেও নজরুল ক্ষোভ জিইয়ে রাখে এবং সুযোগ বুঝে দলবল নিয়ে এ হামলা চালায়।
আহতের ভাগনে আবদুর রশিদ আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “আমার মামা কৃষিকাজ করে দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে টানাটানির সংসার চালাতেন। ডান হাতের কবজি হারিয়ে তিনি আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেলেন। পরিবারটির ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অন্ধকারে। আমরা দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত মোহাম্মদের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
পুলিশের পদক্ষেপ:
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক মোড়ল জানান, “ঘটনাটি জানার পরপরই পুলিশ তৎপর হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও লিখিত এজাহার দায়ের করা হয়নি। লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে মামলা রুজু করা হবে। একই সাথে বর্বরোচিত এ হামলার সাথে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
এস এম সোহাগ ফরাজী