প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রীর বৈঠক: দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্ব, জ্বালানি ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা
কূটনৈতিক প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ ও কানাডার মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সুদৃঢ়করণ, বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রত্যয় নিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে কানাডার একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল।
আজ সোমবার (১২ অক্টোবর ২০২৬) সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাইয়ের নেতৃত্বে এ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান, জ্বালানি নিরাপত্তা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ, কারিগরি শিক্ষা, নার্সিং প্রশিক্ষণ, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অর্থায়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৌশলগত অংশীদারত্ব:
বৈঠকের সূচনাতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে কানাডার নিবিড় সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব প্রত্যাশা করে ঢাকা।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান প্রত্যাবাসনেই:
জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে। একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে আমাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর ওপর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর অপূরণীয় চাপ সৃষ্টি করছে।”
তিনি সুস্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়া সাময়িক স্বস্তি মাত্র, এ সংকটের স্থায়ী ও একমাত্র সমাধান তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ নিজ ভূমে প্রত্যাবাসন। এ সংকটের জন্ম মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও তাদের হাতেই নিহিত। কানাডার প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাই বাংলাদেশের মানবিক অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসনের আবশ্যিকতার বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পূর্ণ একমত পোষণ করেন।
জ্বালানি ও এলএনজি খাতে নতুন সম্ভাবনা:
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে কানাডার পক্ষ থেকে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে খনিজ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে কানাডা বাংলাদেশের একটি দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে পারে বলে প্রতিমন্ত্রী জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার কথা বলেন।
কারিগরি শিক্ষা ও নার্সিং প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ:
দক্ষ মানবসম্পদ বিনির্মাণে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ (TVET) কার্যক্রমে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে অটোয়া। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের নার্সিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং বৈশ্বিক চাহিদাসম্পন্ন দক্ষ নার্স তৈরির চলমান প্রকল্প সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন কানাডীয় প্রতিমন্ত্রী।
কৃষি, কৃষক কার্ড ও খাদ্য নিরাপত্তা:
কৃষি খাতের আধুনিকায়নে ডাল ও তৈলবীজের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সরবরাহব্যবস্থা জোরদারে যৌথ উদ্যোগের বিষয়ে আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের (CIMMYT) কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কানাডা পাশে থাকার অঙ্গীকার করে।
এ সময় সরকারের ‘কৃষক কার্ড’ উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে সরকারি সার, বীজ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ স্বচ্ছতার সাথে বিতরণ করা হবে। উপাত্তভিত্তিক সঠিক পরিকল্পনা ও তথ্য ব্যবস্থাপনায় কানাডার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ উপকৃত হতে পারে।
দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা ও ফ্যামিলি কার্ড:
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের গবেষণা উদ্ধৃত করে উল্লেখ করেন, খাদ্য ভর্তুকি ও বিদ্যমান নগদ সহায়তা সমন্বিত করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা গেলে দেশের অতিরিক্ত প্রায় ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দ্রুত চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা সম্ভব। তাঁর সরকার কেবল সহায়তা প্রদানে সীমাবদ্ধ না থেকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণকে স্থায়ীভাবে স্বাবলম্বী করার নীতি নিয়ে এগোচ্ছে।
জলবায়ু অর্থায়ন ও উন্নয়ন প্রকল্প সমীক্ষা:
বৈঠকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দেশজুড়ে খাল খনন এবং ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলো নিয়ে মতবিনিময় হয়। প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাই জানান, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু অর্থায়নে ১ হাজার ৩০০ কোটি কানাডীয় ডলার বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে কানাডার, যার একটি অংশ জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশ লাভ করতে পারে। পাশাপাশি অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) পরিচালনায় কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহ দেখায় কানাডা।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান ও সফর আমন্ত্রণ:
কানাডায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের মেধা, কর্মদক্ষতা ও ইতিবাচক ভূমিকার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন রণদীপ সরাই। তিনি উল্লেখ করেন, কানাডার মূলধারার রাজনীতিতেও বাংলাদেশিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন এবং দুজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বর্তমানে দেশটির পার্লামেন্ট সদস্য (এমপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বৈঠকের সমাপ্তিতে কানাডার প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অটোয়ায় দ্বিপক্ষীয় আনুষ্ঠানিক সফরে যাওয়ার আন্তরিক আমন্ত্রণ জানান।
এস এম সোহাগ ফরাজী