জুড়ীতে সিএনজি চালক আবুল কালাম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন: বিয়ের প্রস্তাব নাকচ করায় দা দিয়ে কুপিয়ে খুন, আলামতসহ মা-মেয়ে গ্রেফতার
মৌলভীবাজার ব্যুরো / শাহ তোফাজ্জুল হোসেন ভান্ডারী: মৌলভীবাজারের জুড়ীতে সিএনজি অটোরিকশাচালক আবুল কালাম ওরফে বুলুচাঁন (৩৯) হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর ক্লু উদঘাটন করেছে পুলিশ। বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান নিয়ে সৃষ্ট কলহের জেরে তাঁকে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর লাশ গুমের উদ্দেশ্যে কলাগাছের ভেলায় বেঁধে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নিহতের আত্মীয় সম্পর্কে থাকা মা ও মেয়েকে গ্রেফতার করেছে জুড়ী থানা পুলিশ। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা দা ও নিহতের মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেফতারকৃত আসামিদের পরিচয়
গ্রেফতারকৃতরা হলেন—জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ি ইউনিয়নের পূর্ব কচুরগুল নালাপুঞ্জি এলাকার আছমা বেগম (৩৮) এবং তাঁর মেয়ে লিমা আক্তার (১৮)। আছমা নিহত কালামের দ্বিতীয় স্ত্রীর আপন ভাইয়ের স্ত্রী (ননদের স্বামী)। নিহত আবুল কালাম পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নের বড় ধামাই গ্রামের বাসিন্দা।
সম্পর্কের টানাপোড়েন ও হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত আবুল কালামের দুটি সংসার ছিল। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর ভাইয়ের স্ত্রী আছমা বেগমের স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি জীবিকার তাগিদে একটি সিএনজি অটোরিকশা কিনে কালামকে ভাড়ায় চালানোর দায়িত্ব দেন। গাড়ির হিসাব-নিকাশ ও নিয়মিত যাতায়াতের সুবাদে আছমার সঙ্গে কালামের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাতে কালাম আছমার বাড়িতে যান এবং তাঁকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও সামাজিক লোকলজ্জার কথা বিবেচনা করে আছমা সেই প্রস্তাবে অসম্মতি জানান। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা শুরু হলে একপর্যায়ে আছমা ক্ষিপ্ত হয়ে ঘরে থাকা ধারালো দা দিয়ে কালামকে উপর্যুপরি তিনটি কোপ দেন। এতে ঘটনাস্থলেই রক্তাক্ত অবস্থায় কালামের মৃত্যু হয়।
কলাগাছের ভেলায় লাশ গুমের চেষ্টা
হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর আলামত ও লাশ গুম করতে আছমা তাঁর কলেজপড়ুয়া মেয়ে লিমা আক্তারের সহায়তা নেন। মা-মেয়ে মিলে কালামের নিথর দেহটি একটি কলাগাছের ভেলায় রশি দিয়ে বেঁধে বাড়ির পাশের খালে ভাসিয়ে দেন। খাল হয়ে মরদেহটি একপর্যায়ে খরস্রোতা জুড়ী নদীতে চলে যায়।
গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জুড়ীর জায়ফরনগর ইউনিয়নের জাঙ্গিরাই এলাকায় জুড়ী নদীতে মরদেহ ভাসতে দেখে পুলিশে খবর দেন স্থানীয়রা। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদনে নিহতের গলায় ধারালো অস্ত্রের একাধিক গভীর ক্ষতের চিহ্ন পায়।
প্রযুক্তিগত তদন্তে যেভাবে ধরা পড়ল মা-মেয়ে
এ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই হাফিজ উদ্দিন বাদী হয়ে জুড়ী থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পর জুড়ী থানা পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও নিহতের কললিস্ট (সিডিআর) বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন হিসেবে আছমা বেগম ও তাঁর মেয়ে লিমাকে আটক করে।
থানায় এনে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আছমা হত্যাকাণ্ডে নিজের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন এবং লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দেন। পরে তাঁর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী বাড়ি থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা দা ও নিহত কালামের ব্যবহৃত মুঠোফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ।
জুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, অত্যন্ত নিখুঁত ও স্বল্প সময়ের তদন্তে ক্লুলেস এই হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেফতারকৃত মা ও মেয়েকে বিজ্ঞ আদালতে পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। এই রোমহর্ষক ঘটনার নেপথ্যে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা বা কোনো মদদ ছিল কি না, তা আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এস এম সোহাগ ফরাজী